লেখক- শ্রী স্বপন কুমার রায়
মহা ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ ব্যাংক৷
সাধারণ সম্পাদক, শ্রী শ্রী গীতাসংঘ, মতিঝিল শাখা, ঢাকা৷
--------------------------------------
চৌত্রিশটি শ্লোক বিশিষ্ট নবম অধ্যায়ের নাম রাজবিদ্যা-রাজগুহ্যযোগ। অধ্যায়টির নামকরণের বিষয়টিই আসলে আলোচনার দাবী রাখে। এখানে ‘রাজ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে শ্রেষ্ঠ বা উৎকৃষ্ট অর্থে। গুহ্য শব্দের অর্থ গোপনীয় বা যা গোপন রাখারযোগ্য। বিদ্যা শব্দের দ্বিবিধ অর্থ রয়েছে। প্রথমতঃ বিদ্যা বলতে বুঝায় জ্ঞাতব্য বস্তু বা বিষয়। অর্থাৎ যা সম্পর্কে জানতে হবে তাই বিদ্যা। দ্বিতীয়তঃ জ্ঞাতব্য বস্তু বা বিষয় জানার যে উপায় বা পন্থা তা ও বিদ্যা পদবাচ্য। অতএব, রাজবিদ্যা বলতে বুঝা যায় শ্রেষ্ঠ জ্ঞাতব্য বিষয় এবং রাজগুহ্য বলতে বুঝাযায় সেই জ্ঞাতব্য বিষয় সম্পর্কে জানবার চরম গোপন উপায় বা পন্থা। এখন প্রশ্ন হলো জগতে শ্রেষ্ঠ জ্ঞাতব্য বিষয় কি? সনাতন শাস্ত্র বলে ঈশ্বরকে জানাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ জ্ঞাতব্য বিষয়। কাজেই ভগবানের স্বরূপ জানাই হচ্ছে রাজবিদ্যা। এবং ভগবানকে জানার ও লাভ করার সবচেয়ে সহজ ও শ্রেষ্ঠ উপায়ই রাজ্যগুহ্য। এদু’টি বিষয় এ অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে বলেই এঅধ্যায়ের নাম হয়েছে রাজবিদ্যা-রাজগুহ্যযোগ। অধ্যায়টি শ্রীভগবানের উক্তি দিয়েই শুরু হয়েছে। শুরুতেই তিনি অর্জুনকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি অসূয়াশুন্য অর্থাৎ দোষদর্শী নও বিধায় তোমাকে আমি এই অতি গুহ্য বিজ্ঞান সহিত ঈশ্বরবিষয়ক জ্ঞানের কথা বলছি যা জ্ঞাত হলে তুমি সংসার দুঃখ থেকে মুক্ত হবে। অতপর তিনি বিস্তৃতভাবে জানালেন যে, তিনি অক্ষর ও অব্যয় বস্তু হওয়া সত্ত্বেও এজগৎ সংসারে কিভাবে লীলা বিস্তার করছেন বা কিভাবে জগতে বিরাজিত রয়েছেন। ঠিক বায়ু যেমন মহাশুন্যের সর্বস্থানে পরিব্যাপ্ত রয়েছে, তেমনি তিনিও সর্বজীবকে আশ্রয় করে রয়েছেন, অথচ বায়ুর ন্যায় তিনিও অদৃশ্য। তিনিই কল্পারম্ভে সমস্ত প্রকৃতি সৃষ্টি করেন, আবার কল্পক্ষয়ে সর্বভূত তাঁর প্রকৃতিতে লীন হলেও তখনও তিনি-ই জাগরিত থেকে পুনরায় সবকিছু সৃজন করেন। কাজেই এই নিত্য পরিবর্তনশীল জগতে একমাত্র তিনি-ই সত্য ও ধ্রুব। সামান্য পরিবর্তনে মানুষ ভীত, ব্যথিত ও অস্থির হয়, কিন্তু জগতের সকল বিবর্তনে তিনি উদাসীন। জগতের কোন দুঃখ, শোক ও ব্যথা তাকে কখনও স্পর্শ করতে পারেনা। জ্ঞানী ভক্তগণ তাঁর এই অক্ষর স্বরূপ জেনেই তাঁকে নিরন্তর ভজনা করে। এভাবে আত্ম স্বরূপ বর্ণনার পর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে লাভ করার উপায় সম্পর্কেও অর্জুনকে উপদেশ দিলেন। তিনি বললেন, তাঁকে লাভ করার জন্য কেউ কেউ তপস্যা করে থাকে, আবার কেউ কেউ তাঁকে একমাত্র উপাস্য জেনে নিত্য অনন্য ভক্তিসহকারে তাঁর সেবা করে থাকে। তিনি আরও বললেন, কোন ভক্ত যদি একনিষ্ঠ ভক্তিসহকারে তাকে একটিফুল, ফল, একটু জল কিংবা একটি তুলসীপত্রও তাকে দানে করে তবে তিনি তা অতি আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করে থাকেন। আর যেভক্ত তাঁকে সর্বস্ব দান করেন এবং নিত্য অনন্যচিন্ত হয়ে ভজনা করে তিনি সে ভক্তের সকল দায় গ্রহণ করে থাকেন। তাই শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে উপদেশ দিলেন যে, তিনি যেন তার সকল কর্ম, সকলদান, সকল তপস্যা এবং ভোজনীয় দ্রব্য তাঁকে অর্পণ করেন। এভাবে সকল কিছু শ্রীকৃষ্ণে অর্পণকরতঃ তাঁর ভক্ত হয়ে নিরন্তর তাঁর চিন্তায় মগ্ন থাকলে তিনি নিশ্চয়ই তাকে প্রাপ্ত হবেন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।
অনুবাদ: পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে অর্জুন ! তুমি নির্মৎসর বলে তোমাকে আমি পরম বিজ্ঞান সমন্বিত সবচেয়ে গোপনীয় জ্ঞান উপদেশ করছি ৷ সেই জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে তুমি দুঃখময় সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হও।
অনুবাদ: এই জ্ঞান সমস্ত বিদ্যার রাজা, সমস্ত গুহ্যতত্ত্ব থেকেও গুহ্যতর, অতি পবিত্র এবং প্রত্যক্ষ অনুভূতির দ্বারা আত্ম-উপলব্ধি প্রদান করে বলে প্রকৃত ধর্ম। এই জ্ঞান অব্যয় এবং সুখসাধ্য।
অনুবাদ: যদিও সব কিছুই আমারই সৃষ্ট, তবুও তারা আমাতে অবস্থিত নয়। আমার যোগৈশ্বর্য দর্শন কর। যদিও আমি সমস্ত জীবের ধারক এবং যদিও আমি সর্বব্যাপ্ত, তবুও অমি এই জড় সৃষ্টির অন্তর্গত নই, কেন না আমি নিজেই সমস্ত সৃষ্টির উৎস।
অনুবাদ: এভাবেই যারা মোহাচ্ছন্ন হয়েছে, তারা রাক্ষসী ও আসুরী ভাবের প্রতি আকৃষ্ট হয়। সেই মোহাছন্ন অবস্থায় তাদের মুক্তি লাভের আশা, তাদের সকাম কর্ম এবং জ্ঞানের প্রয়াস সমস্তই ব্যর্থ হয়।
অনুবাদ: দৃঢ়ব্রত ও যত্নশীল হয়ে, সর্বদা আমার মহিমা কীর্তন করে এবং আমাকে প্রণাম করে, এই সমস্ত মহাত্মারা নিরন্তর যুক্ত হয়ে ভক্তি সহকারে আমার উপাসনা করে।
অনুবাদ: আমি অগ্নিষ্টোম আদি শ্রৌত যজ্ঞ, আমি বৈশ্ব্যদেব আদি স্মার্ত যজ্ঞ, আমি পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধাদি কর্ম, আমি রোগ নিবারক ভেষজ, আমি মন্ত্র, আমি হোমের ঘৃত, আমি অগ্নি এবং আমিই হোমক্রিয়া।
অনুবাদ: ত্রিবেদজ্ঞগণ যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা আমাকে আরাধনা করে যজ্ঞাবশিষ্ট সোমরস পান করে পাপমুক্ত হন এবং স্বর্গে গমন প্রার্থনা করেন। তাঁরা পুণ্যকর্মের ফলস্বরূপ ইন্দ্রলোক লাভ করে দেবভোগ্য দিব্য স্বর্গসুখ উপভোগ করেন।
অনুবাদ: তাঁরা সেই বিপুল স্বর্গসুখ উপভোগ করে পুণ্য ক্ষয় হলে মর্তলোকে ফিরে আসেন। এভাবেই ত্রিবেদোক্ত ধর্মের অনুষ্ঠান করে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের আকাঙ্ক্ষী মানুষেরা সংসারে কেবলমাত্র বারংবার জন্ম-মৃত্যু লাভ করে থাকেন।
শ্লোক ২২
অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্যুপাসতে। তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যোগক্ষেমং বহাম্যহম্ ॥২২॥
অনুবাদ: অনন্য চিত্তে আমার চিন্তায় মগ্ন হয়ে, পরিপূর্ণ ভক্তি সহকারে যাঁরা সর্বদাই আমার উপাসনা করেন, তাঁদের সমস্ত অপ্রাপ্ত বস্তু আমি বহন করি এবং তাঁদের প্রাপ্ত বস্তুর সংরক্ষণ করি।
অনুবাদ: দেবতাদের উপাসকেরা দেবলোক প্রাপ্ত হবেন; পিতৃপুরুষদের উপাসকেরা পিতৃলোক লাভ করেন; ভূত-প্রেত আদির উপাসকেরা ভূতলোক লাভ করেন; এবং আমার উপাসকেরা আমাকেই লাভ করেন।
অনুবাদ: এভাবেই আমাতে সমস্ত কর্ম অর্পণ দ্বারা শুভ ও অশুভ ফলবিশিষ্ট কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হবে। এভাবেই সন্ন্যাস যোগে যুক্ত হয়ে তুমি মুক্ত হবে এবং আমাকেই প্রাপ্ত হবে।
শ্লোক ২৯
সমোহহং সর্বভূতেষু ন মে দ্বেষ্যোহস্তি ন প্রিয়ঃ ।
যে ভজন্তি তু মাং ভক্ত্যা ময়ি তে তেষু চাপ্যহম্ ॥২৯॥
অনুবাদ: আমি সকলের প্রতি সমভাবাপন্ন। কেউই আমার বিদ্বেষ ভাবাপন্ন নয় এবং প্রিয়ও নয়। কিন্তু যাঁরা ভক্তিপূর্বক আমাকে ভজনা করেন, তাঁরা আমাতে অবস্থান করেন এবং আমিও তাদের মধ্যে বাস করি।
অনুবাদ: পুণ্যবান ব্রাহ্মণ, ভক্ত ও রাজর্ষিদের আর কি কথা ? তাঁরা আমাকে আশ্রয় করলে নিশ্চয়ই পরাগতি লাভ করবেন। অতএব, তুমি এই অনিত্য দুঃখময় মর্ত্যলোক লাভ করে আমাকে ভজনা কর।
অনুবাদ: তোমার মনকে আমার ভাবনায় নিযুক্ত কর, আমার ভক্ত হও, আমাকে প্রণাম কর এবং আমার পূজা কর। এভাবেই মৎপরায়্ণ হয়ে সম্পূর্ণরূপে আমাতে অভিনিবিষ্ট হলে, নিঃসন্দেহে তুমি আমাকে লাভ করবে।
ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে 'রাজবিদ্যারাজগুহ্যযোগো' নাম নবমোঽধ্যায়ঃ ॥৯॥