লেখক- শ্রী স্বপন কুমার রায়
মহা ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ ব্যাংক৷
সাধারণ সম্পাদক, শ্রী শ্রী গীতাসংঘ, মতিঝিল শাখা, ঢাকা৷
--------------------------------------
সাংখ্যযোগ গীতার দ্বিতীয় বৃহত্তম অধ্যায়। এতে ৭২ টি মন্ত্র রয়েছে। সাংখ্য শব্দটি এখানে আত্মতত্ত্ব বা তত্ত্বজ্ঞান অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এ অধ্যায়ের প্রথম থেকে দশম শ্লোক পর্যন্ত অর্জুনের বিষন্নতা নিয়েই আলাচিত হয়েছে। এখানে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অর্জুন শ্রীকৃষ্ণ সমীপে জানতে চেয়েছেন কিভাবে তিনি তার বিষন্নতাকে দূরীভূত করে কর্তব্যকর্ম নির্ধারণ করতে পারেন। প্রিয় ভক্ত অর্জুনের শোক ও বিষাদ অপনোদন করতঃ তাকে কর্তব্যকর্মে উদ্বুদ্ধ করতে শ্রীকৃষ্ণ একাদশ শ্লোক থেকে ত্রিশতম শ্লোক পর্যন্ত আত্মতত্ত্ব আলোচনা করেন। এখানে দেহের নশ্বরতা ও আত্মার অবিনশ্বরতা, দেহ ও সুখ-দুঃখাদির অনিত্যতা এবং আত্মার নিত্যতা সম্পর্কে উপদেশ দিয়েছেন। পন্ডিতগণ কখনও কারো মৃত্যুতে শোক করেন না। এরূপ জ্ঞানোপদেশই এই মন্ত্রগুলোর মূল বিষয়। অতপর পরবর্তী সাতটি শ্লোকে তিনি স্বধর্ম পালনের আবশ্যকতা দেখিয়ে অর্জুনকে যুদ্ধে প্রণোদিত করতে প্রয়াসী হয়েছেন। কিন্ত্ত অর্জুনের সংশয় যে, আত্মা অবিনাশী বলেই কি লোকহত্যায় পাপ হয় না? যুদ্ধ ক্ষত্রিয়ের ধর্ম হলেও কি রাজ্যলাভের জন্য আত্মীয়-স্বজন, গুরুজনদেরকে বধ করা সমীচীন? অর্জুনের এ সংশয় নিরসনের জন্য শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে নিষ্কাম কর্মযোগী হবার পরামর্শ দিলেন। তিনি জানালেন, ফলাকাঙ্খা ত্যাগ করে, লাভ-অলাভ, জয়-পরাজয়কে তুল্য জ্ঞান করে কর্ম করলে তাতে পাপ স্পর্শ করে না। এই সমত্ববুদ্ধি, নিষ্কাম কর্মের উপদেশই প্রদত্ত হয়েছে ৩৮ থেকে ৪০ তম শ্লোকে। অতপর শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ব্যবসায়াত্মিকা ভক্তি বা নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি বা ভক্তির কথা বললেন। নিশ্চয়াত্নিকা ভক্তি সর্বদাই এক, কিন্তু অনিশ্চয়াত্মিকা ভক্তি বহু প্রকারের হয়ে থাকে। অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন বা বিবেকবর্জিত লোকেরা জাগতিক ভোগ ও ঐশ্বর্যে আসক্ত হয়ে পড়ে বিধায় তাদের বুদ্ধি বা ভক্তি একনিষ্ঠ হয় না। কিন্তু ভগবানকে লাভ করতে হলে প্রয়োজন একনিষ্ঠ ভক্তি বা নিশ্চয়াত্মিকা ভক্তি। তাই শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে নির্গুণ স্তরে অধিষ্ঠিত করে সিদ্ধি ও অসিদ্ধিকে সমজ্ঞান করে যোগযুক্ত হয়ে স্বধর্ম বিহিত কর্ম করার উপদেশ দিলেন। অর্জুন তখন শ্রীকৃষ্ণ সমীপে জানতে চাইলেন যে,স্থিত প্রজ্ঞ বা অচলাবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের লক্ষণ কি? তিনি কিভাবে অবস্থান ও বিচরণ করেন? তদুত্তরে শ্রীকৃষ্ণ বললেন যে, জীব যখন সকল মনোগত কাম পরিত্যাগপূর্বক আত্মাতেই পূর্ণ পরিতৃপ্তি লাভ করে তখন তাকে স্থিত প্রজ্ঞ বলা হয়।স্থিত প্রজ্ঞ ব্যক্তি সর্বদা সুখ-দুঃখে অনুদ্বিগ্নমনা এবং তিনি রাগ,ভয়, ক্রোধ থেকে মুক্ত।তাঁর নিকট প্রিয় ও অপ্রিয় বস্তুতেও কোন প্রভেদ নেই। প্রকৃতপক্ষে তিনি সকল জড় বিষয়ে আসক্তি রহিত। কূর্ম তদ্রুপ তার অঙ্গসমূহ তার কঠিন আবরণের মধ্যে লুকিয়ে রাখে, স্থিত প্রজ্ঞ ব্যক্তিও তদ্রুপ তাঁর ইন্দ্রিয়গুলোকে বিষয় থেকে প্রত্যাহার করে চিন্ময় চেতনায় অধিষ্ঠিত থাকেন। পরিশেষে (৭১-৭২ শ্লোক) বলা হয়েছে যে, যিনি জীবনের অন্তিম সময়ে এরূপ ব্রাহ্মিস্থিতি লাভ করেন তিনি এ জড়জগতের সকল বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবৎধামে গমন করেন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।
শ্লোক ১
সঞ্জয় উবাচ
তং তথা কৃপয়াবিষ্টমশ্রুপূর্ণাকুলেক্ষণম্ ।
বিষীদন্তমিদং বাক্যমুবাচ মধুসূদনঃ ॥১॥
অনুবাদ: পুরুষোত্তম শ্রীভগবান বললেন- প্রিয় অর্জুন, এই ঘোর সংঙ্কটময় যুদ্ধস্থলে যারা জীবনের প্রকৃত মূল্য বোঝে না, সেই সব অনার্যের মতো শোকানল তোমার হৃদয়ে কিভাবে প্রজ্জ্বলিত হল ? এই ধরনের মনোভাব তোমাকে স্বর্গলোকে উন্নীত করবে না, পক্ষান্তরে তোমার সমস্ত যশরাশি বিনষ্ট করবে।
অনুবাদ: হে পার্থ ! এই সন্মান হানিকর ক্লীবত্বের বশবর্তী হয়ো না৷ এই ধরনের আচরণ তোমার পক্ষে অনুচিত ।
হে পরন্তপ ! হৃদয়ের এই ক্ষুদ্র দুর্বলতা পরিত্যাগ করে তুমি উঠে দাঁড়াও।
অনুবাদ: অর্জুন বললেন- হে অরিসূদন ! হে মধুসূদন ! এই যুদ্ধক্ষেত্রে ভীষ্ম ও দ্রোণের মতো পরম পূজনীয় ব্যাক্তিদের কেমন করে আমি বাণের দ্বারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব ?
অনুবাদ: আমার মহানুভব শিক্ষাগুরুদের জীবন হানি করে এই জগৎ ভোগ করার থেকে বরং ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করা ভাল। তাঁরা পার্থিব বস্তুর অভিলাষী হলেও আমার গুরুজন। তাঁদের হত্যা করা হলে, যুদ্ধলব্ধ সমস্ত ভোগ্যবস্তু তাঁদের রক্তমাখা হবে।
শ্লোক ৬
ন চৈতদ্ বিদ্মঃ কতরন্নো গরীয়ো যদ্ বা জয়েম যদি বা নো জয়েয়ুঃ ।
যানেব হত্বা ন জিজীবিষামস্ তেহবস্থিতাঃ প্রমুখে ধার্তরাষ্ট্রাঃ ॥৬॥
অনুবাদ: তাদের জয় করা শ্রেয়, না তাদের দ্বারা পরাজিত হওয়া শ্রেয়, তা আমি বুঝতে পারছি না। আমরা যদি ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হ্ত্যা করি, তাহলে আমাদের আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করবে না। তবুও এই রণাঙ্গনে তারা আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে ৷
অনুবাদ: কার্পণ্যজনিত দুর্বলতার প্রভাবে আমি এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছি এবং আমার কর্তব্য সম্বন্ধে বিভ্রান্ত হয়েছি ৷এই অবস্থায় আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি, এখন কি করা আমার পক্ষে শ্রেয়স্কর, তা আমাকে বল। এখন আমি তোমার শিষ্য এবং সর্বতোভাবে তোমার শরণাগত ৷ দয়া করে তুমি আমাকে নির্দেশ দাও ।
অনুবাদ: আমার ইন্দ্রিয়গুলিকে শুকিয়ে দিচ্ছে যে শোক, তা দূর করবার কোন উপায় আমি খুঁজে পাচ্ছি না ৷ এমন কি স্বর্গের দেবতাদের মতো আধিপত্য নিয়ে সমৃদ্ধিশালী, প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন রাজ্য এই পৃথিবীতে লাভ করলেও আমার এই শোকের বিনাশ হবে না।
অনুবাদ: পরমেশ্বর ভগবান বললেন- তুমি প্রাজ্ঞের মতো কথা বলছ, অথচ যে বিষয়ে শোক করা উচিত নয়, সে বিষয়ে শোক করছ। যাঁরা যথার্থই পণ্ডিত তাঁরা কখনও জীবিত অথবা মৃত কারও জন্যই শোক করেন না।
অনুবাদ: দেহীর দেহ যেভাবে কৌমার, যৌবন ও জরার মাধ্যমে তার রূপ পরিবর্তন করে চলে, মৃত্যুকালে তেমনই ঐ দেহী ( আত্মা ) এক দেহ থেকে অন্য কোন দেহে দেহান্তরিত হয়। স্থিতপ্রজ্ঞ পণ্ডিতেরা কখনও এই পরিবর্তনে মুহ্যমান হন না ।
শ্লোক ১৪
মাত্রাস্পর্শাস্তু কৌন্তেয় শীতোষ্ণসুখদুঃখদাঃ ।
আগমাপায়িনোহনিত্যাস্তাংস্তিতিক্ষস্ব ভারত ॥১৪॥
মাত্রাস্পর্শা, তু, কৌন্তেয়, শীত-উষ্ণ-সুখ-দুঃখদাঃ,
আগম-অপায়িনঃ, অনিত্যাঃ, তান্, তিতিক্ষস্ব, ভারত ॥১৪॥
অনুবাদ: হে কৌন্তেয় ! ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের সংযোগের ফলে অনিত্য সুখ ও দুঃখের অনুভব হয় ৷ সেগুলি ঠিক যেন শীত এবং গ্রীষ্ম ঋতুর গমনাগমনের মতো ।
হে ভরতকুল-প্রদীপ ! সেই ইন্দ্রিয়্জাত অনুভূতির দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সেগুলি সহ্য করার চেষ্টা কর।
অনুবাদ: হে পুরুষশ্রেষ্ঠ (অর্জুন) ! যে জ্ঞানী ব্যক্তি সুখ ও দুঃখকে সমান জ্ঞান করেন এবং শীত ও উষ্ণ আদি দ্বন্দ্বে বিচলিত হন না, তিনিই মুক্তি লাভের প্রকৃত অধিকারী।
অনুবাদ: যাঁরা তত্ত্বদ্রষ্টা তাঁরা সিদ্ধান্ত করেছেন যে, অনিত্য জড় বস্তুর স্থায়িত্ব নেই এবং নিত্য বস্তু আত্মার কখনও বিনাশ হয় না। তাঁরা উভয় প্রকৃতির যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।
অনুবাদ: যিনি জীবাত্মাকে হন্তা বলে মনে করেন কিংবা যিনি একে নিহত বলে ভাবেন, তাঁরা উভয়েই আত্মার প্রকৃত স্বরূপ জানেনা না। কারণ আত্মা কাউকে হত্যা করেন না এবং কারও দ্বারা নিহতও হন না।
অনুবাদ: আত্মার কখনও জন্ম হয় না বা মৃত্যু হয় না, অথবা পুনঃ পুনঃ তাঁর উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না৷ তিনি জন্মরহিত শাশ্বত, নিত্য এবং পুরাতন হলেও চিরনবীন। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনও বিনষ্ট হয় না।
অনুবাদ: যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এবং যার মৃত্যু হয়েছে তার জন্মও অবশ্যম্ভাবী। অতএব অপরিহার্য কর্তব্য সম্পাদন করার সময় তোমার শোক করা উচিত নয়।
শ্লোক ২৮
অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত ।
অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা ॥২৮॥
অনুবাদ: হে ভারত ! সমস্ত সৃষ্ট জীব উৎপন্ন হওয়ার আগে অপ্রকাশিত ছিল, তাদের স্থিতিকালে প্রকাশিত থাকে এবং বিনাশের পর আবার অপ্রকাশিত হয়ে যায়। সুতরাং, সেই জন্য শোক করার কি কারণ ?
অনুবাদ: ক্ষত্রিয়রূপে তোমার স্বধর্ম বিবেচনা করে তোমার জানা উচিত যে, ধর্ম রক্ষার্থে যুদ্ধ করার থেকে ক্ষত্রিয়ের পক্ষে মঙ্গলকর আর কিছুই নেই। তাই, তোমার দ্বিধাগ্রস্থ হওয়া উচিত নয়।
অনুবাদ: সমস্ত মহারথীরা মনে করবেন যে, তুমি ভয় পেয়ে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করেছ এবং তুমি যাদের কাছে সম্মানিত ছিলে, তারাই তোমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য জ্ঞান করবে।
অনুবাদ: বিবেকবর্জিত লোকেরাই বেদের পুষ্পিত বাক্যে আসক্ত হয়ে স্বর্গসুখ ভোগ, উচ্চকুলে জন্ম, ক্ষমতা লাভ আদি সকাম কর্মকেই জীবনের চরম উদ্দেশ্য বলে মনে করে। ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ ও ঐশ্বর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তারা বলে যে, তার ঊর্ধ্বে আর কিছুই নেই।
শ্লোক ৪৩
কামাত্মানঃ স্বর্গপরা জন্মকর্মফলপ্রদাম্ ।
ক্রিয়াবিশেষবহুলাং ভোগৈশ্বর্যগতিং প্রতি ॥৪৩॥
কাম-আত্মানঃ, স্বর্গপরাঃ, জন্ম-কর্ম-ফল-প্রদাম্,
ক্রিয়াবিশেষ-বহুলাম্, ভোগ-ঐশ্বর্য-গতিম্, প্রতি ॥৪৩॥
অনুবাদ: বেদে প্রধানত জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণ সম্বন্ধেই আলোচনা করা হয়েছে। হে অর্জুন ! তুমি সেই গুণগুলিকে অতিক্রম করে নির্গুণস্তরে অধিষ্ঠিত হও। সমস্ত দন্দ্ব থেকে মুক্ত হও এবং লাভ-ক্ষতি ও আত্মরক্ষার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে অধ্যাত্ম চেতনায় অধিষ্ঠিত হও।
অনুবাদ: ক্ষুদ্র জলাশয়ে যে সমস্ত প্রয়োজন সাধিত হয়, সেগুলি বৃহৎ জলাশয় থেকে আপনা হতেই সাধিত হয়ে যায়। তেমনই, ভগবানের উপাসনার মাধ্যমে যিনি পরব্রহ্মের জ্ঞান লাভ করে সব কিছুর উদ্দেশ্য উপলব্ধি করেছেন, তাঁর কাছে সমস্ত বেদের উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে।
শ্লোক ৪৭
কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন ।
মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত্বকর্মণি ॥৪৭॥
অনুবাদ: স্বধর্ম বিহিত কর্মে তোমার অধিকার আছে, কিন্তু কোন কর্মফলে তোমার অধিকার নেই। কখনও নিজেকে কর্মফলের হেতু মনে করো না, এবং কখনও স্বধর্ম আচরণ না করার প্রতিও আসক্ত হয়ো না।
অনুবাদ: হে অর্জুন ! ফলভোগের কামনা পরিত্যাগ করে ভক্তিযোগস্থ হয়ে স্বধর্ম-বিহিত কর্ম আচরণ কর। কর্মের সিদ্ধি ও অসিদ্ধি সম্বন্ধে যে সমবুদ্ধি, তাকেই যোগ বলা হয়।
অনুবাদ: হে ধনঞ্জয় ! বুদ্ধিযোগ দ্বারা ভক্তির অনুশীলন করে সকাম কর্ম থেকে দূরে থাক এবং সেই চেতনায় অধিষ্ঠিত হয়ে ভগবানের শরণাগত হও ৷ যারা তাদের কর্মের ফল ভোগ করতে চায়, তারা কৃপণ।
অনুবাদ: যিনি ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করেন, তিনি এই জীবনেই পাপ ও পুণ্য উভয় থেকেই মুক্ত হন। অতএব, তুমি নিষ্কাম কর্মযোগের অনুষ্ঠান কর৷ সেটিই হচ্ছে সর্বাঙ্গীণ কর্মকৌশল।
অনুবাদ: এভাবে পরমেশ্বর ভগবানে অর্পিত নিষ্কাম কর্ম অভ্যাস করতে করতে য্খন তোমার বুদ্ধি মোহরূপ গভীর অরণ্যকে সম্পূর্ণরূপে অতিক্রম করবে, তখন তুমি যা কিছু শুনেছ এবং যা কিছু শ্রবণীয়, সেই সবের প্রতি সম্পূর্ণরূপে নিরপেক্ষ হতে পারবে।
অনুবাদ: তোমার বুদ্ধি যখন বেদের বিচিত্র ভাষার দ্বারা আর বিচলিত হবে না এবং আত্ম-উপলদ্ধির সমাধিতে স্থির হবে, তখন তুমি দিব্যজ্ঞান লাভ করে ভক্তিযোগে অধিষ্ঠিত হবে।
অনুবাদ: অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন- হে কেশব ! স্থিতপ্রজ্ঞ অর্থাৎ অচলাবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের লক্ষণ কি ? তিনি কিভাবে কথা বলেন, কিভাবে অবস্থান করেন এবং কিভাবেই বা তিনি বিচরণ করেন ?
অনুবাদ: পরমেশ্বর ভগবান বললেন-- হে পার্থ ! জীব যখন মানসিক জল্পনা-কল্পনা থেকে উদ্ভূত সমস্ত মনোগত কাম পরিত্যাগ করে এবং তার মন যখন এভাবে পবিত্র হয়ে আত্মাতেই পূর্ণ পরিতৃপ্তি লাভ করে, তখনই তাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয়।
অনুবাদ: ত্রিতাপ দুঃখ উপস্থিত হলেও যাঁর মন উদ্বিগ্ন হয় না, সুখ উপস্থিত হলেও যাঁর স্পৃহা হয় না এবং যিনি রাগ, ভয় ও ক্রোধ থেকে মুক্ত, তিনিই স্থিতধী অর্থাৎ স্থিতপ্রজ্ঞ।
অনুবাদ: জড় জগতে যিনি সমস্ত জড় বিষয়ে আসক্তি রহিত, যিনি প্রিয় বস্তু লাভে আনন্দিত হন না এবং অপ্রিয় বিষয় উপস্থিত হলে দ্বেষ করেন না, তিনি পূর্ণ জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
অনুবাদ: কূর্ম যেমন তার অঙ্গসমূহ তার কঠিন বহিরাবরণের মধ্যে সঙ্কুচিত করে, তেমনই যে ব্যক্তি তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারেন, তাঁর চেতনা চিন্ময় জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত।
অনুবাদ: দেহবিশিষ্ট জীব ইন্দ্রিয় সুখ ভোগ থেকে নিবৃত হতে পারে, কিন্তু তবুও ইন্দ্রিয় সুখ ভোগের আসক্তি থেকে যায়। কিন্তু উচ্চতর স্বাদ আস্বাদন করার ফলে তিনি সেই বিষয়তৃষ্ণা থেকে চিরতরে নিবৃত্ত হন।
অনুবাদ: যিনি তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণরূপে সংযত করে আমার প্রতি উত্তমা ভক্তিপরায়ণ হয়ে তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণরূপে বশীভূত করেছেন, তিনিই স্থিতিপ্রজ্ঞ।
অনুবাদ: ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ সম্বন্ধে চিন্তা করতে করতে মানুষের তাতে আসক্তি জন্মায়, আসক্তি থেকে কাম উৎপন্ন হয় এবং কামনা থেকে ক্রোধ উৎপন্ন হয় ।
ক্রোধ থেকে সম্মোহ, সম্মোহ থেকে স্মৃতিবিভ্রম, স্মৃতিবিভ্রম থেকে বুদ্ধিনাশ এবং বুদ্ধিনাশ হওয়ার ফলে সর্বনাশ হয়। অর্থাৎ, মানুষ পুনরায় জড় জগতের অন্ধকূপে অধঃপতিত হয়।
অনুবাদ: সংযতচিত্ত মানুষ প্রিয় বস্তুতে স্বাভাবিক আসক্তি ও অপ্রিয় বস্তুতে স্বাভাবিক বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয়ে, তাঁর বশীভূত ইন্দ্রিয়ের দ্বারা ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করে ভগবানের কৃপা লাভ করেন।
অনুবাদ: যে ব্যক্তি কৃষ্ণ ভাবনায় যুক্ত নয়, তার চিত্ত সংযত নয় এবং তার পারমার্থিক বুদ্ধি থাকতে পারে না। আর পরমার্থ চিন্তাশূন্য ব্যক্তির শান্তি লাভের কোন সম্ভাবনা নেই৷এই রকম শান্তিহীন ব্যক্তির প্রকৃত সুখ কোথায় ?
অনুবাদ: সমস্ত জীবের পক্ষে যা রাত্রিস্বরূপ, স্থিতপ্রজ্ঞ সেই রাত্রিতে জাগরীত থেকে আত্ম-বুদ্ধিনিষ্ঠ আনন্দকে সাক্ষাৎ অনুভব করেন। আর যখন সমস্ত জীবেরা জেগে থাকে, তত্ত্বদর্শী মুনির নিকট তা রাত্রিস্বরূপ।
অনুবাদ: বিষয়কামী ব্যক্তি কখনো শান্তি লাভ করে না। জলরাশি যেমন সদা পরিপূর্ণ এবং স্থির সমুদ্রে প্রবেশ করেও তাকে ক্ষোভিত করতে পারে না, কামসমূহও তেমন স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তিতে প্রবিষ্ট হয়েও তাঁকে বিক্ষুব্ধ করতে পারে না, অতএব তিনিই শান্তি লাভ করেন৷
অনুবাদ: এই প্রকার স্থিতিকেই ব্রাহ্মীস্থিতি বলে। হে পার্থ ! যিনি এই স্থিতি লাভ করেন, তিনি মোহপ্রাপ্ত হন না ।
জীবনের অন্তিম সময়ে এই স্থিতি লাভ করে, তিনি এই জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবৎ-ধামে প্রবেশ করেন।
ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে 'সাংখ্যযোগো' নাম দ্বিতীয়োঽধ্যায়ঃ ॥২॥