লেখক- শ্রী স্বপন কুমার রায়
মহা ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ ব্যাংক৷
সাধারণ সম্পাদক, শ্রী শ্রী গীতাসংঘ, মতিঝিল শাখা, ঢাকা৷
--------------------------------------
এই অধ্যায়ে দৈব ও অসুরভাবের বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে বলে অধ্যায়ের নাম হয়েছে ‘দৈবাসুরসম্পদবিভাগযোগ’। অধ্যায়ের মোট চব্বিশটি মন্ত্রই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের। তিনি বললেন- এই সংসারে দু’প্রকৃতির মানুষ আছে। এক প্রকার মানুষ দেবপ্রকৃতি সম্পন্ন এবং অন্য প্রকার অসুর প্রকৃতির। পূর্বজন্মের সুকৃতি ও দুস্কৃতির ফল অনুযায়ী মানুষ দেব ও অসুর প্রকৃতি সম্পন্ন হয়ে জন্মায়। দেব প্রকৃতির মানুষ সত্যপরায়ণ, ক্রোধশূন্য, ত্যাগ, দয়া, ক্ষমা-প্রভৃতি গুণের অধিকারী। তারা নির্ভীক ও দানেই তাদের পরিতৃপ্তি। যজ্ঞ তপস্যাদিতেই তাঁরা আনন্দ লাভ করে থাকেন। পক্ষান্তরে দাম্ভিকতা, ক্রোধ, অভিমান-এসব হচ্ছে অসুরপ্রকৃতির মানুষের চিরসহচর। অসুরপ্রকৃতির মানুষেরা ন্যায়-অন্যায় মেনে চলেনা। তারা ঈশ্বরে অবিশ্বাসী ও কামাসক্ত। পৃথিবীর সকল বস্তুই তারা ভোগের সামগ্রী মনে করে থাকে। ভোগে বাধা প্রাপ্ত হলেই তারা ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে। ভক্তিবিহীন অসুর প্রকৃতির মানুষেরা সকল কাজে আড়ম্বরপ্রিয়। অসুরপ্রকৃতির মানুষ মৃত্যুর পর নরকগামী হয় এবং সেখানে নানা দুর্ভোগ সহ্য করার পর পুনরায় পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে থাকে। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।
অনুবাদ: দৈবী সম্পদ মুক্তির অনুকূল, আর আসুরিক সম্পদ বন্ধনের কারণ বলে বিবেচিত হয়। হে পাণ্ডুপুত্র ! তুমি শোক করো না, কেন না তুমি দৈবী সম্পদ সহ জন্মগ্রহণ করেছ।
শ্লোক ৬
দ্বৌ ভূতসর্গৌ লোকেহস্মিন্ দৈব আসুর এব চ ৷ দৈবো বিস্তরশঃ প্রোক্ত আসুরং পার্থ মে শৃণু ॥৬॥
অনুবাদ: হে পার্থ ! এই সংসারে দৈব ও আসুরিক- এই দুই প্রকার জীব সৃষ্টি হয়েছে৷দৈব সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। এখন আমার থেকে অসুর প্রকৃতি সম্বন্ধে শ্রবণ কর।
অনুবাদ: এই প্রকার সিন্ধান্ত অবলম্বন করে আত্মতত্ত্ব-জ্ঞানহীন, অল্প-বুদ্ধিসম্পন্ন, উগ্রকর্মা ও অনিষ্টকারী অসুরেরা জগৎ ধ্বংসকারী কার্যে প্রভাব বিস্তার করে।
শ্লোক ১০
কামমাশ্রিত্য দুঃষ্পূরং দম্ভমানমদান্বিতাঃ ৷ মোহাদ্ গৃহীত্বাসদ্ গ্রাহান্ প্রবর্তন্তেহশুচিব্রতাঃ ॥১০॥
অনুবাদ: অপরিমেয় দুশ্চিন্তার আশ্রয় গ্রহণ করে মৃত্যুকাল পর্যন্ত ইন্দ্রিয়সুখ ভোগকেই তারা তাদের জীবনের চরম উদ্দেশ্য বলে মনে করে। এভাবেই শত শত আশাপাপে আবদ্ধ হয়ে এবং কাম ও ক্রোধ-পরায়ণ হয়ে তারা কাম উপভোগের জন্য অসৎ উপায়ে অর্থ সঞ্চয়ের চেষ্টা করে।
অনুবাদ: অসুরস্বভাব ব্যক্তিরা মনে করে- "আজ আমার দ্বারা এত লাভ হয়েছে এবং আমার পরিকল্পনা অনুসারে আরও লাভ হবে। এখন আমার এত ধন আছে এবং ভবিষ্যতে আরও ধন লাভ হবে৷ ঐ শত্রু আমার দ্বারা নিহ্ত হয়েছে এবং অন্যান্য শত্রুদেরও আমি হ্ত্যা করব। আমিই ঈশ্বর, আমি ভোক্তা৷ আমিই সিদ্ধ, বলবান ও সুখী। আমি সবচেয়ে ধনবান এবং অভিজাত আত্মীয়-স্বজন পরিবৃত। আমার মতো আর কেউ নেই। আমি যজ্ঞ অনুষ্ঠান করব, দান করব এবং আনন্দ করব।" এভাবেই অসুরস্বভাব ব্যক্তিরা অজ্ঞানের দ্বারা বিমোহিত হয়। নানা প্রকার দুঃশ্চিন্তায় বিভ্রান্ত হয়ে এবং মোহজালে বিজড়িত হয়ে কামভোগে আসক্তচিত্ত সেই ব্যক্তিরা অশুচি নরকে পতিত হয়।
অনুবাদ: অহঙ্কার, বল, দর্প, কাম ও ক্রোধকে আশ্রয় করে অসুরেরা স্বীয় দেহে ও পরদেহে অবস্থিত পরমেশ্বর স্বরূপ আমাকে দ্বেষ করে এবং সাধুদের গুণেতে দোষারোপ করে।