লেখক- শ্রী স্বপন কুমার রায়
মহা ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ ব্যাংক৷
সাধারণ সম্পাদক, শ্রী শ্রী গীতাসংঘ, মতিঝিল শাখা, ঢাকা৷
--------------------------------------
জগতপ্রকৃতি পরিচালিত হয় তিনটি গুণের দ্বারা। গুণ তিনটি হচ্ছে সত্ত্ব, রজো ও তমো। জীব মাত্রই এই তিন গুণের অধীন। এই তিনটি গুণের উৎপত্তি, স্বরূপ, গতি, প্রকৃতি, প্রভাব সম্পর্কে আলোচ্য অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে বলেই এই অধ্যায়ের নাম হয়েছে গুণত্রয়বিভাগযোগ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে উপলক্ষ্য করে জানালেন যে, সত্ত্ব, রজো ও তমো – এই তিনটি গুণ মূলতঃ প্রকৃতি হতে উৎপন্ন এবং এই তিনটি গুণ জীবাত্মার বন্ধনস্বরূপ। সত্ত্বগুণ নির্মলহলেও ইহা সুখ ও জ্ঞানের আসক্তি থেকে উৎপন্ন হয় এবং ইহাও আত্মার একপ্রকার বন্ধনস্বরূপ। কামনা ও ভোগাসক্তি থেকে রজোগুণের উৎপত্তি। ইহা জীবাত্মাকে কর্ম ও তার ফলের আসক্তি দ্বারা বন্ধন করে। এছাড়া, অজ্ঞান থেকে তমোগুণের উদ্ভব। ইহা জীবাত্মাকে নিদ্রা, আলস্য ও প্রমাদ দ্বারা আবদ্ধ করে। প্রকৃতিজাত এই তিনটি গুণ প্রতিটি জীবের মধ্যেই বিদ্যমান এবং এরা পর্যায়ক্রমে জীবের মধ্যে ক্রিয়াশীল হয়ে উঠে। তাই জীবদেহে কখনও সত্ত্বগুণের প্রাবল্য, আবার কখনও রজোগুণের এবং তারপর তমোগুণের প্রাবল্য দেখা দেয়। যখন যে গুণের প্রাবল্য দেখা দেয় তখন অন্যদু’টি গুণ জীবদেহে স্তিমিত থাকে। গুণের প্রাবল্য তার কারণে দেহে তার প্রভাবও ভিন্নতর হয়ে থাকে। যেমন সত্ত্বগুণের প্রাধান্য দেখায় তখন জীব সৎকাজ ও সুখে আসক্ত হয়। আবার রজোগুণের প্রাবল্যতাবশতঃ জীব কর্মে আসক্ত এবং তমোগুণের কারণে জীব পাশবিক ও প্রমাদে আসক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মোক্ষলাভ বা ব্রহ্মপ্রাপ্তির জন্য জীবকে অবশ্যই এই তিন গুণের উর্দ্ধে উঠতে হবে। পরমেশ্বর ভগবান ত্রিগুণাতীত। সে কারণে গুণাতীত ঈশ্বরকে পেতে হলে বা মোক্ষলাভ করতে হলে মানবকে অবশ্যই এইতিন গুণের অতীত অবস্থায় উন্নীত হতে হবে। সেটাই জীবের সাধনার চরম ও পরম প্রাপ্তি। এভাবেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে উপদেশ দান করেছেন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।
অনুবাদ: পরমেশ্বর ভগবান বললেন- পুনরায় আমি তোমাকে সমস্ত জ্ঞানের মধ্যে সর্বোত্তম জ্ঞান সম্বন্ধে বলব, যা জেনে মুনিগণ এই জড় জগৎ থেকে পরম সিদ্ধি লাভ করেছিলেন।
অনুবাদ: হে ভারত ! রজ ও তমোগুণকে পরাভূত করে সত্ত্বগুণ প্রবল হয়, সত্ত্ব ও তমোগুণকে পরাভূত করে রজোগুণ প্রবল হয় এবং সেভাবেই সত্ত্ব ও রজোগুণকে পরাভূত করে তমোগুণ প্রবল হয়।
অনুবাদ: সত্ত্বগুণ- সম্পন্ন ব্যক্তিগণ উর্ধ্বে উচ্চতর লোকে গমন করে, রজোগুণ-সম্পন্ন ব্যক্তিগণ মধ্যে নরলোকে অবস্থান করে এবং জঘন্য গুণসম্পন্ন তামসিক ব্যক্তিগণ অধঃপতিত হয়ে নরকে গমন করে।
অনুবাদ: জীব যখন দর্শন করেন যে, প্রকৃতির গুণসমূহ ব্যতীত কর্মে অন্য কোন কর্তা নেই এবং জানতে পারেন যে, পরমেশ্বর ভগবান এই সমস্ত গুণের অতীত, তখন তিনি আমার পরা প্রকৃতি লাভ করেন।
অনুবাদ: অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন- হে প্রভু ! যিনি প্রকৃতির তিন গুণের অতীত, তিনি কি কি লক্ষণ দ্বারা জ্ঞাত হন ? তাঁর আচারণ কি রকম ? এবং তিনি কিভাবে এই তিন গুণ অতিক্রম করেন ?
অনুবাদ: পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে পাণ্ডব ! যিনি প্রকাশ, প্রবৃত্তি ও মোহ আবির্ভূত হলে দ্বেষ করেন না এবং সেগুলি নিবৃত্ত হলেও আকাঙ্ক্ষা করেন না; যিনি উদাসীনের মতো অবস্থিত থেকে গুণসমূহের দ্বারা বিচলিত হন না, কিন্তু গুণ সমূহ স্বীয় কার্যে প্রবৃত্ত হয়, এভাবেই জেনে অবস্থান করেন এবং তার দ্বারা চঞ্চলতা প্রাপ্ত হন না; যিনি আত্মস্বরূপে অবস্থিত এবং সুখ ও দুঃখে সম-ভাবাপন্ন; যিনি মাটির ঢেলা, পাথর ও স্বর্ণে সমদৃষ্টি-সম্পন্ন; যিনি প্রিয় ও অপ্রিয় বিষয়ে সম-ভাবাপন্ন; যিনি ধৈর্যশীল এবং নিন্দা, স্তুতি, মান ও অপমানে সম-ভাবাপন্ন; যিনি শত্রু ও মিত্র উভয়ের প্রতি সমভাব-সম্পন্ন এবং যিনি সমস্ত কর্মোদ্যম পরিত্যাগী- তিনিই গুণাতীত বলে কথিত হন।