লেখক- শ্রী স্বপন কুমার রায়
মহা ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ ব্যাংক৷
সাধারণ সম্পাদক, শ্রী শ্রী গীতাসংঘ, মতিঝিল শাখা, ঢাকা৷
--------------------------------------
পুরুষ ও প্রকৃতি, দেহ ও আত্মা, জ্ঞান ও জ্ঞেয় ইত্যাদি তত্ত্বের সম্যক ধারণা ব্যতিত পরমেশ্বরের সমগ্র স্বরূপ জানা যায় না। তাই অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকেই অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সমীপে জানতে চাইলেন- প্রকৃতি ও পুরুষ, ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ এবং জ্ঞান ও জ্ঞেয় বস্তু কী – সে সম্পর্কে। তদুত্তোরে শ্রীকৃষ্ণ বললেন, ভগবানই পুরুষ এবং তাঁর শক্তিই প্রকৃতি নামে খ্যাত। আর এই দেহ হচ্ছে ক্ষেত্র এবং এদেহ সম্পর্কে যিনি সম্যকরূপে জানেন তিনিই ক্ষেত্রজ্ঞ। এখানে প্রশ্ন থাকতে পারে যে, এ দেহ সম্পর্কে একজন দেহধারীও সম্যকরূপে জানতে পারেন। হ্যা, কোন দেহধারী দেহ সম্পর্কে সম্যকভাবে জ্ঞাত হলে তিনিও ক্ষেত্রজ্ঞ হতে পারেন। তবে বিষয়টি হচ্ছে যে একজন দেহধারী হয়তো তার নিজ দেহ সম্পর্কে ভাল জানতে পারেন, কিন্তু নিখিল বিশ্বের সকল দেহের সম্যক জ্ঞান একমাত্র পরমেশ্বর ছাড়া অন্য কারো থাকা সম্ভব নয়। তাই পরমেশ্বর ভগবানই প্রকৃত ক্ষেত্রজ্ঞ। অতপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জ্ঞান ওজ্ঞেয় সম্পর্কে বললেন, প্রকৃতি ও পুরুষের সংযোগে থেকেই জীবের উৎপত্তি এবং এই জগৎ-জীবের বাইরে এবং ভেতরেও অন্তরআত্মা রূপে তিনি বিরাজিত। কাজেই সেই পুরুষ ও প্রকৃতি তথা ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ সম্পর্কিত যে জ্ঞান তাকেই জ্ঞান বলে এবং প্রকৃতির অন্তরাত্মারূপী যে ব্রহ্মসত্ত্বা- তাই হচ্ছে জ্ঞাতব্য বিষয় বা জ্ঞেয়। এই প্রকৃতি ও পুরুষ উভয়ই অনাদি এবং তাদের বিকার ও গুণসমূহ প্রকৃতি হতেই উৎপন্ন। জড়া প্রকৃতিতে অবস্থিত হয়ে জীব প্রকৃতিজাত গুণসমূহ ভোগ করে। প্রকৃতির গুণের সঙ্গবশতঃই তার সৎ ও অসৎ যোনিসমূহে জন্ম হয়ে থাকে। এই শরীরে আর একজন আছেন, যিনি হচ্ছেন উপদ্রষ্টা, অনুমন্তা, ভর্তা, ভোক্তা, মহেশ্বর এবং তাকে পরমাত্মাও বলা হয়। যিনি এই পরমাত্মাকে এবং জড়া প্রকৃতি সম্পর্কে সম্যকরূপে জ্ঞাত হন, তিনিই জন্ম-মৃত্যু অতিক্রম করে চিরমুক্তি লাভ করেন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।
অনুবাদ: সেই ক্ষেত্র কি, তার কি প্রকার, তার বিকার কি, তা কার থেকে উৎপন্ন হয়েছে, সেই ক্ষেত্রজ্ঞের স্বরূপ কি এবং তার প্রভাব কি, সেই সব সংক্ষেপে আমার কাছে শ্রবণ কর।
অনুবাদ: এই ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের জ্ঞান ঋষিগণ কর্তৃক বিবিধ বেদবাক্যের দ্বারা পৃথক পৃথকভাবে বর্ণিত হয়েছে। বেদান্তসূত্রে তা বিশেষভাবে যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত সহকারে বর্ণিত হয়েছে।
অনুবাদ: অমানিত্ব, দম্ভশূন্যতা, অহিংসা, সহিষ্ণুতা, সরলতা, সদ্ গুরুর সেবা, শৌচ, স্থৈর্য, আত্মসংযম্, ইন্দ্রিয়-বিষয়ে বৈরাগ্য, অহঙ্কারশূন্যতা, জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি-দুঃখ আদির দোষ দর্শন, স্ত্রী-পুত্রাদির সুখ-দুঃখে ঔদাসীন্য, সর্বদা সমচিত্তত্ব, আমার প্রতি অনন্যা ও অব্যভিচারিণী ভক্তি, নির্জন স্থান প্রিয়তা, জনাকীর্ণ স্থানে অরুচি, অধ্যাত্ম জ্ঞানে নিত্যত্ববুদ্ধি এবং তত্ত্বজ্ঞানের প্রয়োজন অনুসন্ধান- এই সমস্ত জ্ঞান বলে কথিত হয় এবং এর বিপরীত যা কিছু তা সবই অজ্ঞান।
অনুবাদ: আমি এখন জ্ঞাতব্য বিষয় সম্বন্ধে বলব, যা জেনে অমৃতত্ত্ব লাভ হয়। সেই জ্ঞেয় বস্তু অনাদি এবং আমার আশ্রিত। তাকে বলা হয় ব্রহ্ম এবং তা কার্য ও কারণের অতীত।
অনুবাদ: সেই পরমাত্মা সমস্ত ইন্দ্রিয়ের প্রকাশক, তবুও তিনি সমস্ত ইন্দ্রিয় বিবর্জিত। যদিও তিনি সকলের পালক তবুও তিনি সম্পূর্ণ অনাসক্ত। তিনি প্রকৃতির গুণের অতীত, তবুও তিনি সমস্ত গুণের ঈশ্বর।
অনুবাদ: সেই পরমতত্ত্ব সমস্ত ভূতের অন্তরে ও বাহিরে বর্তমান। তাঁর থেকেই সমস্ত চরাচর; অত্যন্ত সূক্ষ্মতা হেতু তিনি অবিজ্ঞেয়। যদিও তিনি বহু দূরে অবস্থিত, তবুও তিনি সকলের অত্যন্ত নিকটে।
অনুবাদ: তিনি সমস্ত জ্যোতিষ্কের পরম জ্যোতি৷ তাঁকে সমস্ত অন্ধকারের অতীত অব্যক্ত স্বরূপ বলা হয়। তিনিই জ্ঞান, তিনিই জ্ঞেয় এবং তিনিই জ্ঞানগম্য তিনি সকলের হৃদয়ে অবস্থিত।
অনুবাদ: য্খন বিবেকী পুরুষ জীবগণের পৃথক পৃথক অস্তিত্বকে একই প্রকৃতিতে অবস্থিত এবং একই প্রকৃতি থেকেই তাদের বিস্তার দর্শন করেন, তখন তিনি ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হন।
অনুবাদ: ব্রহ্মভাব অবস্থায় জীব তখন দর্শন করেন যে, অব্যয় এই আত্মা অনাদি, নির্গুণ ও জড়া প্রকৃতির অতীত। হে কৌন্তেয় ! জড় দেহে অবস্থান করলেও আত্মা কোন কিছু করে না এবং কোন কিছুতেই লিপ্ত হয় না।
অনুবাদ: যাঁরা এভাবেই জ্ঞানচক্ষুর দ্বারা ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের পার্থক্য জানেন এবং জড়া প্রকৃতির বন্ধন থেকে জীবগণের মুক্ত হওয়ার পন্থা জানেন, তাঁরা পরম গতি লাভ করেন।
ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে 'ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগো' নাম ত্রয়োদশোঽধ্যায়ঃ ॥১৩॥