লেখক- শ্রী স্বপন কুমার রায়
মহা ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ ব্যাংক৷
সাধারণ সম্পাদক, শ্রী শ্রী গীতাসংঘ, মতিঝিল শাখা, ঢাকা৷
--------------------------------------
গীতার দশম অধ্যায়টির নাম বিভূতিযোগ। বিভূতি শব্দের অর্থ প্রকাশ। ভগবানের বিভূতি মানে ভগবানের অলৌকিক শক্তির নানারূপ প্রকাশ। এই অধ্যায়ের মূখ্য আলোচ্য বিষয়টিই হচ্ছে ভগবানের বিভূতি। তাই ইহা বিভূতিযোগ নামে অভিহিত। অধ্যায়টি শুরু হয়েছে শ্রীকৃষ্ণের উক্তি দিয়েঁই। তিনি অর্জুনের হিতার্থে তাঁর পরম রহস্যময় প্রভাব সম্পর্কে অধিক কিছু বলবেন বলে আশ্বস্ত করলেন। তিনি বললেন, তাঁর প্রভাব বা উৎপত্তির বিষয়ে মনুষ্যগণ তো বটেই, এমনকি দেবগণ ও জ্ঞাত নহেন। কারণ, তিনি দেব ও মহর্ষিগণেরও আদিকারণ। বস্তুত ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সমস্ত জগতেরই উৎপত্তির কারণ এবং তাঁর থেকেই সমগ্র জগৎ প্রবর্তিত হয়। কাজেই জ্ঞানী ভক্তগণ ইহা জেনে তাকে ভজনা করেন। যারা আত্মসমর্পণপূর্বক তাঁর ভজনা করেন, তিনি তাদেরকে সৎ বুদ্ধি প্রদান করেন এবং তাদের মনে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে দেন যাতে সেই আলোকে ভক্ত তাঁকেই লাভ করতে পারে। শ্রীকৃষ্ণ সমীপে এত কিছু শ্রবণ করে অর্জুন বললেন যে, তাঁর কথায় তার মোহান্ধকার দূরীভূত হয়েছে বটে কিন্তু তাঁর বিভূতির বিষয়ে জানবার একান্ত বাসনা জেগেছে। তখন অর্জুনের এ বাসনা পূরণার্থে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অনন্ত বিভূতির কথা বলতে লাগলেন। ভগবান তাঁর অনন্ত বিভূতি সম্পর্কে অর্জুনকে যা বলেছেন তার মর্মার্থ করলে এটাই দাঁড়ায় যে, এ জগতে যা কিছু বৃহৎ, মহৎ, মহান, বিশাল, গুণবান, কল্যাণকর ও সুন্দর তার মধ্যেই তাঁর বিভূতি। ঈশ্বর আছেন বলেই জগতটাকে এত সুন্দর লাগে, সর্বভূতে তিনি অন্তরাত্মারূপে বিরাজমান বলেই জগতের নর-নারী, বৃক্ষলতা, পশু-পাখী- সবই মনোরম ও আকর্ষণীয়। প্রেমময় ভগবানের উপস্থিতির কারণেই সর্বভূতে প্রেমের সম্পর্ক চিরন্তর বিদ্যমান এবং এই প্রেম ও ভালবাসা জগত সংসারকে সুখ, আনন্দ ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করছে। অধ্যায়ের শেষ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাই তাঁর অনন্ত বিভূতির উপসংহার টেনে অর্জুনকে বললেন, শুধু এটুকুই তার জানা প্রয়োজন যে তিনি তাঁর একাংশ মাত্র দ্বারা সমস্ত জগতকে ধারণ করে অবস্থিত আছেন। এভাবেই এ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অনন্ত বিভূতির কথা ব্যক্ত করলেন শ্রীমান অর্জুনের সমীপে। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।
অনুবাদ: পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে মহাবাহো ! পুনরায় শ্রবণ কর৷ যেহেতু তুমি আমার প্রিয় পাত্র, তাই তেমার হিতকামনায় আমি পূর্বে যা বলেছি, তার থেকেও উৎকৃষ্ট তত্ত্ব বলছি ।
অনুবাদ: বুদ্ধি, জ্ঞান, সংশয় ও মোহ থেকে মুক্তি, ক্ষমা, সত্যবাদিতা, ইন্দ্রিয়-সংয্ম, মনসংযম, সুখ, দুঃখ, জন্ম, মৃত্যু, ভয়, অভয়, অহিংসা, সমতা, সন্তোষ, তপস্যা, দান, য্শ ও অয্শ- প্রাণিদের এই সমস্ত নানা প্রকার ভাব আমার থেকেই উৎপন্ন হয়।
অনুবাদ: সপ্ত মহর্ষি, তাঁদের পূর্বজাত সনকাদি চার কুমার ও চতুর্দশ মনু, সকলেই আমার মন থেকে উৎপন্ন হয়ে আমা হতে জন্মগ্রহণ করেছে এবং এই জগতের স্থাবর-জঙ্গম আদি সমস্ত প্রজা তাঁরাই সৃষ্টি করেছেন।
অনুবাদ: যাঁদের চিত্ত ও প্র্রাণ সম্পূর্ণরূপে আমাতে সমর্পিত, তাঁরা পরস্পরের মধ্যে আমার কথা সর্বদাই আলাচনা করে এবং আমার সম্বন্ধে পরস্পরকে বুঝিয়ে পরম সন্তোষ ও অপ্রাকৃত আনন্দ লাভ করেন।
অনুবাদ: যাঁরা ভক্তিযোগ দ্বারা প্রীতিপূর্বক আমার ভজনা করে নিত্যযুক্ত, আমি তাঁদের শুদ্ধ জ্ঞানজনিত বুদ্ধিযোগ দান করি, যার দ্বারা তাঁরা আমার কাছে ফিরে আসতে পারেন।
অনুবাদ: অর্জুন বললেন- তুমি পরম ব্রহ্ম, পরম ধাম, পরম পবিত্র ও পরম পুরুষ৷ তুমি নিত্য, দিব্য, আদি দেব, অজ ও বিভু। দেবর্ষি নারদ, অসিত, দেবল, ব্যাস আদি ঋষিরা তোমাকে সেভাবেই বর্ণনা করেছেন এবং তুমি নিজেও এখন আমাকে তা বলছ।
অনুবাদ: হে জনার্দন ! তোমার যোগ ও বিভূতি বিস্তারিতভাবে পুনরায় আমাকে বল৷ কারণ তোমার উপদেশামৃত পান করে আমার পরিতৃপ্তি হচ্ছে না; আমি আরও শ্রবণ করতে ইচ্ছা করি।
অনুবাদ: সমস্ত অস্ত্রের মধ্যে আমি বজ্র, গাভীদের মধ্যে আমি কামধেনু ৷সন্তান উৎপাদনের কারণ আমিই কামদেব এবং সর্পদের মধ্যে আমি বাসুকি। সমস্ত নাগদের মধ্যে আমি অনন্ত এবং জলচরদের মধ্যে আমি বরুণ৷ পিতৃদের মধ্যে আমি অর্যমা এবং দণ্ডদাতাদের মধ্যে আমি যম।
অনুবাদ: হে অর্জুন ! সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে আমি আদি, অন্ত ও মধ্য৷ সমস্ত বিদ্যার মধ্যে আমি অধ্যাত্মবিদ্যা এবং তার্কিকদের বাদ, জল্প ও বিতণ্ডার মধ্যে আমি সিন্ধান্তবাদ।
অনুবাদ: সমস্ত হরণকারীদের মধ্যে আমি সর্বগ্রাসী মৃত্যু, ভাবীকালের বস্তুসমূহের মধ্যে আমি উদ্ভব ৷ নারীদের মধ্যে আমি কীর্তি, শ্রী, বাণী, স্মৃতি, মেধা, ধৃতি ও ক্ষমা ।