লেখক- শ্রী স্বপন কুমার রায়
মহা ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ ব্যাংক৷
সাধারণ সম্পাদক, শ্রী শ্রী গীতাসংঘ, মতিঝিল শাখা, ঢাকা৷
--------------------------------------
৪৬টি শ্লোকবিশিষ্ট গীতার প্রথম অধ্যায়টি ‘অর্জুনবিষাদযোগ’ নামে পরিচিত। এ অধ্যায়ে অর্জুনের বিষাদ-ই মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। অধ্যায়টি শুরু হয়েছে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের উক্তি দিয়ে এবং শেষ হয়েছে তার মন্ত্রী সঞ্জয়ের উক্তি দিয়ে। এ অধ্যায়ে তৃতীয় পান্ডব মহাবীর অর্জুনের উক্তির মাধ্যমে ব্যক্ত তার বিষাদই মূল সুর। প্রসংগত উল্লেখ্য যে, গীতার সকল কথাই ধৃতরাষ্ট্রের সমীপে বিবৃত করা হয় সঞ্জয় কর্তৃক হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে। ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন জন্মান্ধ। তিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তার পুত্রগণ এবং পান্ডব পুত্রগণের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের বর্ণনা তার মন্ত্রী সঞ্জয়ের নিকট জানতে চেয়েছিলেন। ধর্মপ্রাণ সঞ্জয় ব্যাসদেবের কৃপায় দিব্যদৃষ্টি লাভ করেছিলেন বিধায় তিনি প্রাসাদে থেকেই যুদ্ধক্ষেত্রের সকল ঘটনা দর্শন এবং কথা শ্রবণ করতে পেরেছিলেন এবং তা ধৃতরাষ্ট্রকে অবহিত করেছিলেন। অন্ধ মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়ের নিকট জানতে চাইলেন যে, ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে তার যুদ্ধাভিলাষী পুত্রগণ এবং পান্ডু পুত্রগণ সমবেত হয়ে কী করেছিলেন। তদুত্তরে সঞ্জয় রাজাকে জানালেন যে, তার পুত্র দুর্যোধন পান্ডবপক্ষের সৈন্যসজ্জা অবলোকন করে গুরু দ্রোণাচার্যের নিকট গিয়ে বর্ণনা করতে লাগলেন পান্ডবপক্ষে কোন্ কোন্ মহারথী যুদ্ধ করতে এসেছেন এবং তারই (দ্রোণাচার্যের) প্রিয় শিষ্য দৃষ্টদুম্ন কিভাবে পান্ডবপক্ষের সৈন্যসজ্জা পরিচালনা করছেন। অতপর তিনি তার নিজের পক্ষের মহাবীর ও মহারথীগণের সম্বন্ধেও দ্রোণাচার্যকে অবহিত করে এ মর্মে মন্তব্য করলেন যে, পান্ডবদের সৈন্য সসীম কিন্ত তাদের সৈন্য অপরিমিত। দুর্যোধনের নিকট থেকে সব অবহিত হবার পর কুরুবংশের বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্মদেব দুর্যোধনের হর্ষ উৎপাদনের জন্য সিংহের গর্জনের ন্যায় উচ্চনাদে শঙ্খধ্বনি করলেন। সেই সাথে কৌরব পক্ষের অন্যরাও তাদের নিজ নিজ শঙ্খ, ভেরী, পনব, আনক, শিঙ্গা ধ্বনি করলে সবকিছু মিলে এক তুমুল শব্দের সৃষ্টি হলো। অপরপক্ষে শ্বেত অশ্বযুক্ত দিব্য রথে স্থিত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনও তাদের নিজ নিজ শঙ্খধ্বনি করলে এ তুমুল শব্দ আকাশ ও পৃথিবী প্রতিধ্বনিত করে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণের হৃদয় বিদারিত করতে লাগলো। এ সময় ধনুর্ধর অর্জুন ধনুক ও শর হস্তে ধারণ করে কৌরবপক্ষের যোদ্ধাগণকে দেখার মানসে তার রথের সারথি শ্রীকৃষ্ণকে উভয় সেনাদলের মাঝখানে রথখানি স্থাপন করতে অনুরোধ করলেন। রথখানি যথাস্থানে স্থাপিত হলে অর্জুন লক্ষ্য করলেন তার সম্মুখে ভীষ্ম, দ্রোণ প্রমুখ গুরুজনের সাথে মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, শশুর, মিত্র ও শুভাকাংখীগণ উপস্থিত রয়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে বিপক্ষে আচার্য,আত্মীয়-স্বজনদের অবলোকন করে অর্জুন বিষাদগ্রস্থ হলেন। বিষাদিত অর্জুনের সর্বশরীর কম্পিত ও রোমাঞ্চিত হতে লাগলো এবং তার হস্ত থেকে গান্ডিব যেন খসে পড়ছে। যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক ও করুণ পরিণতির কথা ভেবে অস্থির অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বললেন যে, তিনি এ যুদ্ধ করবেন না, কারণ তিনি এতে কোন মঙ্গল দেখছেন না। যু্দ্ধের চরম অমঙ্গলের কারণ হিসেবে এ মর্মে যুক্তি উপস্থাপন করলেন যে, যুদ্ধে গুরুজনকে হত্যা করে রাজ্যসুখ ভোগ করলে মহাপাপ তাদের আচ্ছন্ন করবে। তাছাড়া আত্মীয় স্বজনকে বধ করে রাজ্য লাভে কোন সুখ ও শান্তি নেই কারণ পুত্র, পৌত্র, ভ্রাতা, আত্মীয় বধ করলে কুলক্ষয় হয়, কুলক্ষয়ে কুলধর্ম বিনষ্ট হয় এবং তাহলে সমগ্র বংশ অধর্মে নিপাতিত হয়। কুল অধর্মে অভিভুত হলে কুলস্ত্রীগণ ব্যভিচারী হয়, তা থেকে বর্ণ সঙ্কর উৎপাদিত হলে কুলঘাতকেরা নরকগামী হয়। সেকুলে পিন্ডদান ও তর্পণক্রিয়া লোপ পাওয়ায় পিতৃপুরুষেরাও নরকে অধঃপতিত হয়। এসব কথা উচ্চারণ করে অর্জুন অত্যন্ত বিষন্ন মনে শ্রীকৃষ্ণ সমীপে মন্তব্য করলেন যে, তাকে নিরস্ত্র অবস্থায় শস্ত্রধারী ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ যুদ্ধে বধ করলেও তার অধিকতর মঙ্গল হবে। এভাবে অর্জুন রণক্ষেত্রে ধনুর্বান ত্যাগ করতঃ শোকভারাক্রান্ত চিত্তে রথোপরি উপবেশন করলেন। যুদ্ধের করুণ ভয়াবহ পরিণতির ভাবনা অর্জুনের ভেতর যে বিহবলতা, বিষন্নতা ও হৃদয়-দৌর্বল্য সৃষ্টি করেছিল তাই প্রকটিত হয়ে উঠেছে প্রথম অধ্যায় ‘অর্জুন বিষাদযোগে’। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।
অনুবাদ: হে আচার্য ! পাণ্ডবদের মহান সৈন্যবল দর্শন করুন, যা আপনার অত্যন্ত বুদ্ধিমান শিষ্য দ্রুপদের পুত্র অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যূহের আকারে রচনা করেছেন।
অনুবাদ: সেখানে রয়েছেন আপনার মতোই ব্যক্তিত্বশালী-ভীষ্ম, কর্ণ, কৃপা, অশ্বত্থামা , বিকর্ণ ও সোমদত্তের পুত্র ভূরিশ্রবা, যাঁরা সর্বদা সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে থাকেন।
অনুবাদ: এ ছাড়া আরও বহু সেনানায়ক রয়েছেন, যাঁরা আমার জন্য তাঁদের জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত।
তাঁরা সকলেই নানা প্রকার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং তাঁরা সকলেই সামরিক বিজ্ঞানে বিশারদ।
অনুবাদ: তখন, শ্রীকৃষ্ণ পাঞ্চজন্য নামক তাঁর শঙ্খ বাজালেন, অর্জুন বাজালেন, তাঁর দেবদত্ত নামক শঙ্খ এবং বিপুল ভোজনপ্রিয় ও ভীমকর্মা ভীমসেন বাজালেন পৌণ্ড্র নামক তাঁর ভয়ংকর শঙ্খ।
শ্লোক ১৬
অনন্তবিজয়ং রাজা কুন্তীপুত্রো যুধিষ্ঠিরঃ।
নকুলঃ সহদেবশ্চ সুঘোষমণিপুষ্পকৌ ॥১৬॥
অনুবাদ: হে মহারাজ ! তখন মহান ধনুর্ধর কাশীরাজ, প্রবল যোদ্ধা শিখণ্ডী, ধৃষ্টদ্যুম্ন, বিরাট, অপরাজিত সাত্যকি, দ্রুপদ, দ্রৌপদীর পুত্রগণ, সুভদ্রার মহা বলবান পুত্র এবং অন্য সকলে তাঁদের নিজ নিজ পৃথক শঙ্খ বাজালেন।
অনুবাদ: সেই সময় পান্ডু পুত্র অর্জুন হনুমান চিহ্নিত পতাকা শোভিত রথে অধিষ্ঠিত হয়ে তাঁর ধনুক তুলে নিয়ে শ্বর নিক্ষেপ করতে প্রস্তুত হলেন। হে মহারাজ ! ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের সমর সজ্জায় বিন্যস্ত দেখে অর্জুন তখন শ্রীকৃষ্ণকে এই কথাগুলি বললেন-
অনুবাদ: তখন অর্জুন উভয় পক্ষের সেনাদলের মধ্যে পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য, মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, শ্বশুর, মিত্র ও শুভাকাংক্ষীদের উপস্থিত দেখতে পেলেন।
অনুবাদ: অর্জুন বললেন- হে প্রিয়বর কৃষ্ণ ! আমার সমস্ত বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের এমনভাবে যুদ্ধাভিলাষী হয়ে আমার সামনে অবস্থান করতে দেখে আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশ হচ্ছে এবং মুখ শুষ্ক হয়ে উঠছে।
অনুবাদ: হে কেশব ! আমি এখন আর স্থির থাকতে পারছি না। আমি আত্মবিস্মৃত হচ্ছি এবং আমার চিত্ত উদ্ ভ্রান্ত হচ্ছে। হে কেশীদানবহন্তা শ্রীকৃষ্ণ ! আমি কেবল অমঙ্গলসূচক লক্ষণসমূহ দর্শন করছি।
অনুবাদ: হে গোবিন্দ ! আমাদের রাজ্যে কি প্রায়োজন, আর সুখভোগ বা জীবন ধারনেই বা কী প্রয়োজন, যখন দেখছি- যাদের জন্য রাজ্য ও ভোগসুখের কামনা, তারা সকলেই এই রণক্ষেত্রে আজ উপস্থিত? হে মধুসূদন ! যখন আচার্য, পিতৃব্য, পুত্র, পিতামহ, মাতুল, শ্বশুর, পৌত্র, শ্যালক ও আত্মীয়স্বজন, সকলেই প্রাণ ও ধনাদির আশা পরিত্যাগ করে আমার সামনে যুদ্ধে উপস্থিত হয়েছেন, তখন তাঁরা আমাকে বধ করলেও আমি তাঁদের হত্যা করতে চাইব কেন? হে সমস্ত জীবের প্রতিপলক জনার্দন ! পৃথিবীর তো কথাই নেই, এমন কি সমগ্র ত্রিভুবনের বিনিময়েও আমি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত নই। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের নিধন করে কি সন্তোষ আমরা লাভ করতে পারব?
অনুবাদ: এই ধরনের আততায়ীদের বধ করলে মহাপাপ আমাদের আচ্ছন্ন করবে। সুতরাং বন্ধুবান্ধব সহ ধৃতরাষ্ট্র্রের পুত্রদের সংহার করা আমাদের পক্ষে অবশ্যই উচিত হবে না। হে মাধব , লক্ষ্মীপতি শ্রীকৃষ্ণ ! আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করে আমাদের কী লাভ হবে ? আর তা থেকে আমরা কেমন করে সুখী হব ?
অনুবাদ: হে জনার্দন ! যদিও এরা রাজ্যলোভে অভিভূত হয়ে কুলক্ষয় জনিত দোষ ও মিত্রদ্রোহ নিমিত্ত পাপ লক্ষ্য করছে না, কিন্তু আমরা কুলক্ষয় জনিত দোষ লক্ষ্য করেও এই পাপ কর্মে কেন প্রবৃত্ত হব ?
অনুবাদ: হে কৃষ্ণ ! কুল অধর্মের দ্বারা অভিভূত হলে কুলবধূগণ ব্যভিচারে প্রবৃত্ত হয় এবং হে বার্ষ্ণেয় ! কুলস্ত্রীগণ অসৎ চরিত্রা হলে অবাঞ্ছিত প্রজাতি উৎপন্ন হয়।
অনুবাদ: বর্ণসঙ্কর উৎপাদন বৃদ্ধি হলে কুল ও কুলঘাতকেরা নরকগামী হয়। সেই কুলে পিণ্ডদান ও তর্পণক্রিয়া লোপ পাওয়ার ফলে তাদের পিতৃপুরুষেরাও নরকে অধঃপতিত হয়।
অনুবাদ: যারা বংশের ঐতিহ্য নষ্ট করে এবং তার ফলে অবাঞ্ছিত সন্তানাদি সৃষ্টি করে, তাদের কুকর্মজনিত দোষের ফলে সর্বপ্রকার জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প এবং বংশের কল্যাণ-ধর্ম উৎসন্নে যায়। ফলে সনাতন জাতিধর্ম ও কুলধর্মও বিনষ্ট হয়।