প্রাচীন মন্দির পেল নতুন জীবন, জিতল কাশ্মীরিয়ত



Last Updated (Sunday, 31 January 2010 15:34)
Written by Radha Krishna
Sunday, 31 January 2010 15:25
নিজস্ব সংবাদদাতা, শ্রীনগর

ত্রিলোকি নাথ গাঞ্জু-র বয়স এখন ৮২। প্রায় কুড়ি বছর পর পূরণ রাজ ভৈরবের মন্দিরে ফের পুজো দিতে পারলেন তিনি। সৌজন্যে, আসিফ গনি সোফি আর তাঁর পড়শিরা।
সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার পরে দলে দলে ঘর ছেড়েছেন কাশ্মীরি পণ্ডিতরা। মাটি কামড়ে যাঁরা পড়েছিলেন, ত্রিলোকি তাঁদেরই এক জন। আজ কুড়ি বছর পরে ভৈরবের মন্দিরে আবার যখন পুজো শুরু হল, ত্রিলোকি পৌরোহিত্য করলেন। তাঁকে ঘিরে রইলেন সাজগারিপোরা-হাওয়াল এলাকার তাবৎ বাসিন্দা, সকলেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী।
পূরণ রাজ ভৈরবের মন্দিরটি বহু প্রাচীন। এমনিতে কোনও বিগ্রহ নেই। চত্বরের ভিতরে একটি তুঁতগাছকেই পবিত্র জ্ঞানে পুজো করা হত। পাহাড়ি ঝরনাটিকে ঘিরে গোল হয়ে বসে মেন্ত্রাচ্চারণ করতেন ভক্তেরা। সে সব কুড়ি বছর আগের কথা। এর মধ্যে পুজো-আচ্চা আর হয়নি। মন্দিরের দরজা অবশ্য খোলাই থাকত। ছেলেপুলেরা ঢুকে খেলাধুলো করত। কিন্তু পরিস্থিতিটা বদলাতে শুরু করল দিন কয়েক আগে থেকে।
২৮ বছরের যুবক আসিফ গনি সোফি এলাকারই বাসিন্দা। তিনিই বলছিলেন ঘটনাটা। কিছু দিন আগে হঠাৎই বাইরের কিছু লোক এলাকায় হাজির হয়ে বলে, মন্দিরের জমিটা তারা কিনে নিয়েছে। কাশ্মীরে জঙ্গি আন্দোলন শুরু হওয়ার আগের কালে এই মন্দিরের দেখভাল করত একটি ট্রাস্ট। সেই ট্রাস্টের কাছ থেকেই তারা জমিটা নিয়েছে বলে দাবি করে, কিছু নথিপত্রও দেখায়। আসিফ আর তাঁর বন্ধুদের কাছে কিন্তু বিষয়টা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়নি। তাঁরা প্রথমে জেলা প্রশাসন, তার পর সটান পুলিশে যোগাযোগ করলেন। খবর দেওয়া হল কাশ্মীর পণ্ডিত সংঘর্ষ সমিতিকেও (কেপিএসএস)। যে পণ্ডিতরা শত সমস্যা সত্ত্বেও কাশ্মীর ছেড়ে যাননি, কেপিএসএস তাঁদেরই সংগঠন। সম্প্রতি বেশ কিছু পুরনো মন্দির নতুন করে খোলার ব্যাপারে এগিয়ে এসেছেন তাঁরা। আসিফ বলেন, “যাদের মন্দির তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়াটাই আমি মনে করি, আমার ধর্র্মীয় কর্তব্য।”
সেই নয়ের দশক থেকে লাগাতার সন্ত্রাসের সঙ্গে ঘর করেছে কাশ্মীর। প্রায় দু’লক্ষ পণ্ডিত এখনও ঘরছাড়া। কিন্তু তুলনামূলক শান্তির আবহে আবার ফিরছে পুরনো নাড়ির টান। মহমম্দ আসলাম মনে করতে পারেন, সাজগারিপোরা-হাওয়াল এলাকায় পণ্ডিত পরিবারের বসতি কোনও দিনই সে ভাবে ছিল না। আজও নেই। এতগুলো বছর মন্দিরটাকে আগলে রেখেছেন স্থানীয় মুসলিমরাই। গত কাল যখন আবার নতুন করে পুজোর জোগাড় হল, আশপাশ থেকে সিঁদুর-প্রদীপ সব এনে ব্যবস্থা করলেন ওঁরাই। কেপিএসএস-এর কর্ণধার সঞ্জয় টিকু ঠিক করেছেন, শিবরাত্রির পরে মন্দিরের ঝরনাটি সংস্কার করা হবে। সে কাজেও হাত লাগাবেন এই পড়শিরা। টিকু বলেন, “আমরা চাই এই মন্দিরগুলো শািন্ত আর সহাবস্থানের প্রতীক হয়ে উঠুক। যৌথ ম্যানেজিং কমিটি তৈরি হোক।”
কুড়ি বছর পরে গত কাল আবার ঘণ্টা বেজে উঠেছে পূরণ রাজ ভৈরবের মন্দিরে। পুজো করেছেন বৃদ্ধ ত্রিলোকি নাথ। এত দিন পরে তাঁর মনে হচ্ছে, “আমরা বেঁচে আছি, আমাদের সংস্কৃতিও বেঁচে আছে।” সহমত টিকু-আসলাম-আসিফ সকলেই। ওঁরাই বাঁচিয়ে রেখেছেন কাশ্মীরিয়তকে।
আনন্দবাজার, কলকাতা, ১৭ মাঘ ১৪১৬ রবিবার ৩১ জানুয়ারি ২০১০
http://www.anandabazar.com/31desh1.htm